
খন্দকার মোহাম্মাদ আলী
দুর্নীতি অনুসন্ধান নিউজ
দেশের প্রায় ৬৮ হাজার গ্রামে বসবাস করছে ১৮ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। প্রতিনিয়ত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানুষকে সময়ের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলতে হচ্ছে। সচেতন মানুষের জ্ঞানের আলোয় অসচেতন মানুষও জীবনের নানা ব্যবধান বুঝতে শিখছে এবং সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় গ্রাম্য মাতব্বরদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জ্ঞানের আলোয় সমাজের অজ্ঞ মানুষ সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা পায় এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন শুধরে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সমাজে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার উদাহরণ ও বাস্তবতার সমন্বয়ে গ্রাম্য মাতব্বররা সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকেন। তাদের সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন হয় মীমাংসিত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে।
তবে পক্ষপাতিত্ব বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সমাজের চোখে মাতব্বররা বিবেকহীন হিসেবে পরিচিত হন। অন্যদিকে জনস্বার্থে নিবেদিত, সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করা মাতব্বররা মানুষের প্রশংসা অর্জন করেন। যুগ যুগ ধরে এই প্রথা সমাজ জীবনে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
যদিও রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রাম্য মাতব্বরদের কোনো সম্মানজনক স্বীকৃতি বা প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয় না, তবুও তারা বছরের পর বছর পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে উন্নয়ন অনুসন্ধান ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী অনুসন্ধানী ব্যক্তিদের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সমস্যার পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকারবিষয়ক সংকট উঠে এসেছে। এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে গিয়ে মূলধারার সমাজ ব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকাতে হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
এ ব্যাপারে বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামের এক প্রবীণ মাতব্বর জানান, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কুফল সমাজ ব্যবস্থার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। মাতব্বরদের ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি কিংবা প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থেকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক জীবন পরিচালনা করতে হয়। স্রষ্টার নির্দেশনা মেনে বিবেক ও জ্ঞানের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমেই একজন আদর্শ মানুষ সমাজসেবক ও মাতব্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
সমাজে প্রবীণ মাতব্বরদের জ্ঞানের ভাণ্ডারে রয়েছে অসংখ্য সমস্যার সমাধান। মানুষের সমস্যাভেদে তারা উপযুক্ত দিকনির্দেশনা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। ফলে পথভ্রষ্ট মানুষও সঠিক পথের সন্ধান পেয়ে অশান্ত জীবন থেকে স্বস্তি ফিরে পায় এবং ভুক্তভোগীরা মাতব্বরদের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠেন। এভাবেই সমাজের মানুষ একে অপরের সঙ্গে মতাদর্শিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
তবে এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সমাজে প্রকৃত মাতব্বরদের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রভাব, কালো টাকার ব্যবহার, ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রভাব এবং আইনের অপব্যবহারসহ নানা প্রতিবন্ধকতা। এসব সমস্যা সমাজ ব্যবস্থাকে ঘুণে ধরা বাঁশের মতো দুর্বল করে তুলছে।
বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতা নিয়েই ব্যস্ত, প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন, ধর্মগুরুরা ওয়াজ-নসিহত ও আয়-রোজগারে ব্যস্ত, আর সাধারণ কর্মজীবী মানুষ পরিবার চালানোর সংগ্রামে নিমগ্ন। এভাবেই রাষ্ট্রীয় জীবনের বাস্তব চিত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণ জীবনের নানা সমস্যার কার্যকর সমাধানে গ্রাম্য মাতব্বরদের ইতিবাচক ও নিঃস্বার্থ ভূমিকা কাজে লাগিয়ে গণমানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
তারিখ: ১২ মে ২০২৬
খন্দকার মোহাম্মদ আলী 







