
মোঃ আইনুল ইসলাম
রংপুর বিভাগীয় প্রধান,
দুর্নীতি অনুসন্ধান নিউজ।
*বিশেষ ফিচার প্রতিবেদন:*
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের CCU-র একটি বেডে শুয়ে আছেন শতবর্ষী এক মা—মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন প্রতিনিয়ত। ১৯-০৪-২০২৬ ইং তারিখে দুপুরের দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, মুখ-নাক দিয়ে কফ বের হওয়া এবং অচেতনপ্রায় অবস্থায় তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গেছে— হার্ট ফেইল, লিভারে পানি জমা, রক্তে মারাত্মক ইনফেকশন, চিকিৎসা চলছে, পরীক্ষা চলছে—কিন্তু এর বাইরেও উঠে এসেছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক গল্প, যা আমাদের সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মুমূর্ষু মুহূর্তে এক সন্তানের লড়াই
মায়ের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হলে ছোট ছেলে দিশেহারা হয়ে পড়েন।
তিনি দ্রুত ঢাকার সহকারী অধ্যাপক (ইউরোলজি) তার শৈশবের বন্ধু ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরামর্শ অনুযায়ী নেবুলাইজেশন, অক্সিজেনের ব্যবস্থা ও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।এরপর—ভাই-বোনদের খবর দেওয়াঅ্যাম্বুলেন্স জোগাড়, জরুরি বিভাগ থেকে CCU-তে ভর্তি, সবকিছুই ঘটে দ্রুত সময়ের মধ্যে। এই লড়াইয়ে পাশে ছিল তার স্ত্রী—কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—অন্য সন্তানেরা কোথায় ছিলেন? নীরবতা, দেরি আর দায়িত্বহীনতা অভিযোগ উঠেছে—পরিবারের কিছু স্বচ্ছল, প্রতিষ্ঠিত ও সমাজে সম্মানিত সন্তান খবর পেয়েও দেরিতে এসেছেন, কেউ কেউ আসেননি দুঃখিনী মাকে দেখতে।অথচ সমাজে তাদের পরিচয়—“হাজী”, “প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী”, “মুন্সী প্রতিষ্ঠানের সদস্য”।এই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়— পরিচয় বড়, নাকি দায়িত্ব বড়? দীর্ঘদিনের অসুস্থতা: এক দুঃখিনী মায়ের নিঃশব্দ যুদ্ধ, এই মা বহু বছর ধরে গুরুতর অসুস্থ—নিউমোনিয়া, তিনবার ব্রেন স্ট্রোক, বর্তমানে তিনি—নিজে হাঁটতে পারেন না, একা উঠতে পারেন না, স্বাভাবিকভাবে তার প্রয়োজনও প্রকাশ করতে পারেন না, ডাইপারের উপর নির্ভরশীল, ওষুধ পিষে খাওয়াতে হয়, গোসল, খাওয়া—সবকিছু অন্যের সহায়তায়।অর্থাৎ, তিনি এখন একেবারে শিশুর মতো নির্ভরশীল। থেরাপি—বাঁচার শেষ ভরসা, তবুও অবহেলা, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে—নিয়মিত ব্যায়াম ও থেরাপি চালু থাকলে তিনি কিছুটা দাঁড়াতে পারেন, ধীরে হাঁটতে পারেন। কিন্তু থেরাপি বন্ধ হলেই—তার হাত-পা শক্ত হয়ে যায়, শরীর প্রায় অচল হয়ে পড়ে। প্রতিদিন মাত্র ২৫০ টাকায় একজন সিস্টার এসে এই থেরাপি ও দেখানো ব্যায়াম দিয়ে থাকেন। কিন্তু অভিযোগ—স্বচ্ছল পরিবারের কিছু সদস্য এই সামান্য খরচটুকুও নিয়মিত বহন করেন না।একটি ঘরে ত্যাগের গল্প—স্বামী, স্ত্রী ও মা, ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী—বিয়ের পর থেকেই একটি ঘরে মাকে নিয়ে বসবাস করছেন। মা রাতে ছোট শিশুর মতো ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমান, পাশে না থাকলে কাঁদতে থাকেন, “বাবা বাবা” বলে ডাকেন।এই বাস্তবতা বুঝে—স্ত্রী নিজের দাম্পত্য জীবনের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, তিন বছরেও—কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি, এমনকি শ্বশুর বাড়ীর গ্রামের বাসাও একটিবার যাওয়া হয়নি, অসংখ্য আত্মীয়দের দাওয়াতে যাওয়া হয়নি।ব্যক্তিগত সময় বলতে কিছু নেই।এক স্ত্রীর কষ্ট, এক পরিবারের নীরব কান্না,মাঝে মাঝে স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেন— “আমাদের দাম্পত্য জীবনটা শাশুড়ী মায়ের সেবায় উজাড় করে দিলাম, কিন্তু আমাদের নিজের স্বপ্নগুলো যেন হারিয়ে গেল…”এই কষ্ট শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি দায়িত্ববান মানুষদের নিঃশব্দ ত্যাগের প্রতিচ্ছবি। ধর্ম ও বিবেকের আলোকে কঠিন সত্য, ইসলাম স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয়—পিতা-মাতার খেদমত সর্বোচ্চ ইবাদতের একটি। রাসূল (স.) বলেছেন— “পিতামাতার সন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি।”— হজ করে এসে যদি অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়ানো না যায়, তবে সেই হজের শিক্ষা কোথায়? সমাজের জন্য কঠিন বার্তা, সম্পদ, পরিচয়, খ্যাতি—সবই অর্থহীন যদি একজন অসহায় মায়ের পাশে দাঁড়ানো না যায়।যে ঘরে বৃদ্ধ পিতা-মাতা আছেন—সেই ঘরই প্রকৃত মক্কা-মদিনা।বাইরে দান-খয়রাত দেখিয়ে,ভেতরে দায়িত্ব ভুলে গেলে—সেটা মানবতার নয়, ভণ্ডামির পরিচয়। এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি আমাদের সমাজের একটি আয়না। আজ প্রশ্ন একটাই— আমরা কি আমাদের পিতা-মাতার হক আদায় করছি?নাকি পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের দায় লুকিয়ে রাখছি? দোয়া:আল্লাহ এই অসহায় মাকে শিফা দান করুন, এবং আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার খেদমত করার তাওফিক দিন। বিশেষ ঘোষণা:এ ধরনের শিক্ষামূলক, সমাজ-জাগরণমূলক বিশেষ ফিচার ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আগামীতে আরও বৃহৎ পরিসরে প্রকাশিত হবে—ইনশাআল্লাহ।
মায়ের স্লোগান:
১.“পরিচয় নয়—মায়ের সেবাই একজন সন্তানের আসল পরিচয়”
২.“হজে নয়, মায়ের সেবায় প্রমাণ হয়—কে সত্যিকারের মানুষ”।
মোঃআইনুল ইসলাম 










